আত্মশক্তি ফাউন্ডেশন

সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা

সংস্কৃত ভারতবর্ষের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা। প্রায় পাঁচ হাজার বছর যাবৎ এ ভাষার চর্চা অব্যাহত রয়েছে। ঋগ্বেদে এ ভাষার প্রাচীন রূপটি পরিদৃষ্ট হয়। ঋগ্বেদ থেকে উপনিষদের কাল পর্যন্ত এ ভাষা বৈদিক ভাষা নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে সাধারণ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল তাকে কেবল ‘ভাষা’ বলা হতো। পরে সংস্কারের মাধ্যমে গৃহীত হওয়ায় এর নাম হয় ‘সংস্কৃত’। এই ভাষাটিকে সংস্কৃত বা পরিমার্জিত ভাষা মনে করা হয়। এই কারণে এই ভাষা একটি "পবিত্র" ও "অভিজাত" ভাষা। প্রাচীন ভারতে ধর্মীয় ও শিক্ষাদান-সংক্রান্ত উদ্দেশ্যে লোকপ্রচলিত প্রাকৃত ("প্রাকৃতিক, শিল্পগুণবর্জিত, স্বাভাবিক ও সাধারণ") ভাষার পরিবর্তে এই ভাষা ব্যবহৃত হত। এই ভাষাকে "দেবভাষা" বলা হত; কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই ভাষা ছিল "দেবগণ ও উপদেবতাগণের ভাষা"।

কাল ও বিষয়গত দিক থেকে সংস্কৃত ভাষার দুটি স্তর: বৈদিক ও লৌকিক। এই লৌকিক ভাষাই ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষা নামে পরিচিত। পাণিনিকৃত অষ্টাধ্যায়ী সংস্কৃত ভাষার প্রধান ব্যাকরণগ্রন্থ। পরবর্তীকালে বার্ত্তিককার বররুচি (বা কাত্যায়ন) এবং ভাষ্যকার পতঞ্জলির মাধ্যমে অষ্টাধ্যায়ী পূর্ণতা লাভ করে। তাই এর এক নাম হয় ত্রিমুনিব্যাকরণ।

সংস্কৃত প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা নামেও পরিচিত। আর্যভাষা তিনটি স্তরে বিভাজিত: প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা-  বৈদিক ও সংস্কৃত; মধ্যভারতীয় আর্যভাষা-   পালি,  প্রাকৃত ও  অপভ্রংশ এবং নব্যভারতীয় আর্যভাষা-  বাংলা, অসমিয়া, উড়িয়া, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি ইত্যাদি। ভাষা অর্থে ‘সংস্কৃত’ শব্দের প্রথম ব্যবহার দেখা যায় পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য রামায়ণে (সুন্দরকান্ড, ৩০/১৭-১৮)।

সংস্কৃত ভাষার অনুশীলন বর্তমানে ভারতেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশেও প্রাচীন যুগ থেকেই এ ভাষার চর্চা হয়ে আসছে এবং বর্তমানেও সীমিতভাবে হচ্ছে। বিভিন্ন বোর্ডের, বিশেষত ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও যশোর বোর্ডের অধীন অনেক স্কুল-কলেজে সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্যের চর্চা হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর এবং এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ে সংস্কৃতের চর্চা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পাস ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে সংস্কৃত অধ্যয়নের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডের অধীন টোল-চতুষ্পাঠীগুলিতেও সনাতন পদ্ধতিতে সংস্কৃত শিক্ষা দেওয়া হয়। এই বোর্ড থেকে সংস্কৃতের বিভিন্ন শাখায় আদ্য, মধ্য ও উপাধি পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।

সংস্কৃত ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। যে অঞ্চলে এর চর্চা হয়েছে সেই অঞ্চলে প্রচলিত বর্ণমালাই এতে গৃহীত হয়েছে। তবে নাগরী বা দেবনাগরী বর্ণমালা সংস্কৃতের জন্য ব্যাপকভাবে গৃহীত, বোধ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

স্বরবর্ণ পরিচয়:

ঋৃ
लृ
অং अं
অঃ अः

 



ব্যঞ্জনবর্ণ পরিচয়:

न,ऩ
ब,व
য, য়
र,ऱ
ड़
ढ़

 


 

স্বরবর্ণ উচ্চারণ:

  দেবনাগরী বাংলা রোমান प+কার প+কার   দেবনাগরী বাংলা রোমান प+কার প+কার
কণ্ঠ a ā पा পা
তালব্য i पि পি ī पी পী
ওষ্ঠ u पु পু ū पू পূ
মূর্ধণ্য पृ পৃ पॄ পৄ
দন্ত पॢ পৢ पॣ পৣ
কণ্ঠতালব্য e पे পে ai पै পৈ
কণ্ঠোষ্ঠ o पो পো au पौ পৌ
অনুনাসিক aṃ पं পং   aṅ पँ পঁ
  aḥ पः পঃ   ऽ (লুপ্ত অ)   पऽ পঽ

 

 

ব্যঞ্জনবর্ণ উচ্চারণ:

  স্পর্শ অনুনাসিক অন্তস্থ উষ্মা
ঘোষধ্বনি → অঘোষ ঘোষ অঘোষ ঘোষ
মহাপ্রাণতা → অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণ অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণ অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণ
কণ্ঠ ka
/k/
kha
/kʰ/
ga
/ɡ/
gha
/ɡʱ/
ṅa
/ŋ/
  ha
/ɦ/
তালব্য ca
/c, t͡ʃ/
cha
/cʰ, t͡ʃʰ/
ja
/ɟ, d͡ʒ/
jha
/ɟʱ, d͡ʒʱ/
ña
/ɲ/
ya
/j/
śa
/ɕ, ʃ/
 
মূর্ধণ্য ṭa
/ʈ/
ṭha
/ʈʰ/
ḍa
/ɖ/
ḍha
/ɖʱ/
ṇa
/ɳ/
ra
/r/
ṣa
/ʂ/
দন্ত ta
/t̪/
tha
/t̪ʰ/
da
/d̪/
dha
/d̪ʱ/
na
/n/
la
/l/
sa
/s/
ওষ্ঠ pa
/p/
pha
/pʰ/
ba
/b/
bha
/bʱ/
ma
/m/
va
/w, ʋ/
 

 

 

সংস্কৃত উচ্চারণ বিধি

সংস্কৃত ভাষার শ্লোক বা মন্ত্র বাংলা অক্ষরে লেখা হলেও এর উচ্চারণ মূল সংস্কৃত ভাষার উচ্চারণের নিয়ম অনুযায়ী হবে। বাংলা ভাষার উচ্চারণ রীতিতে সংস্কৃত উচ্চারণ অনেক ক্ষেত্রেই ভুল হয়। সংস্কৃত পাঠকদের সুবিধার্থে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো উল্লেখ করা হলো।

ক) সর্বদা স্মরণীয়
সংস্কৃত ভাষায় ঠিক যে যে বর্ণ দ্বারা শব্দ গঠিত হয়, প্রতিটি বর্ণকে হুবহু তার মতো করেই উচ্চারণ করতে হয়। যেমন- গীতার ১ম শ্লোকের ‘কিমকুর্বত’ শব্দটি উচ্চারণ করতে হবে ‘কিম্অর্কুবত্অ’। এখানে ‘ম’ এবং ‘ত’ এর উচ্চারণ ‘ম্+অ’ এবং ‘ত্+অ’। কোন বর্ণের শেষে হস্ ( ্) চিহ্ন না থাকলে সেখানে ‘অ’ উচ্চারণ থাকবে।

খ) সংযুক্ত বর্ণ
সংযুক্ত প্রতিটি বর্ণের স্বতন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়। যেমন- আত্মা = আৎমা, তীক্ষ্ণ = তীক্+ষ্+ণ, লক্ষ্মী = ল+ক্+ষ্+মী, মোক্ষ = মো+ক্+ষ, ইত্যাদি।

গ) বিসর্গ (ঃ)
কোন পদে যে বর্ণের পরে বিসর্গ থাকবে সেই বর্ণের স্থান হতে অর্ধ ‘হ’ (হ্)-এর মতো উচ্চারণ করতে হবে। যেমন- ‘মামকাঃ’ শব্দটার উচ্চারণ হবে ‘মামকাহ্’, সঞ্জয়ঃ = সঞ্জয়হ্, ‘দুঃখ’ = ‘দুহ্খ’, ইত্যাদি।

ঘ) য ও য-ফলা
য-এর উচ্চারণ হবে ‘ইয়’এর মতো। যেমন- ‘যম’ এর উচ্চারণ হবে ‘ইয়ম’। এভাবে যুদ্ধ = ইয়ুদ্ধ, কাম্য = কাম্ইয়, ক্লৈব্যং = ক্লৈব্ইয়ং, ইত্যাদি।

ঙ) ব-ফলা
ব-ফলার উচ্চারণ হবে ‘উয়’এর মতো। যেমন- অম্ব = অম্উয়, বিদ্বান = বিদ্উয়ান্অ, ত্বাং = ত্উয়াং, ইত্যাদি।

চ) স, ষ, শ
দন্ত্য স-এর উচ্চারণ দন্তমূলে, কিছুটা বাংলা ‘ছ’-এর কাছাকাছি।  সংস্কৃতে দন্ত্য স বর্ণটি বস্তু, অস্ত, সমস্ত, আস্তিক শব্দসমূহের ‘স’ এর মতো সর্বদা উচ্চারিত হবে। মূর্ধণ্য ষ-এর উচ্চারণস্থান মূর্ধা অর্থাৎ দন্তমূলের পেছনে খাঁজকাটা অংশে। যেমন- পাষণ্ড, কুষ্মাণ্ড, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। তালব্য শ-এর উচ্চারণস্থান মূর্ধার পেছনে মসৃণ তালুতে। যেমন- শারদীয়, শালা, শশী।

ছ) র, ড় ও ঢ়
র-এর উচ্চারণ ‘বারি’, ‘বর’ শব্দের ‘র’এর মতো (দন্তমূলে)। ড়-এর উচ্চারণ বাড়ি, বড় শব্দের মতো (মূর্ধায়)। অপরদিকে ‘ঢ়’এর উচ্চারণ ব্যূঢ়ং, আষাঢ় শব্দের ঢ়-এর মতো (তালুতে)।

জ) ন ও ণ
দন্ত্য ন-এর উচ্চারণ হয় দন্তমূলে। যেমন- নৈনং, নানান, অনেক ইত্যাদি। মূর্ধণ্য ণ উচ্চারণ করতে জিহ্বার অগ্রভাগ উল্টিয়ে মূর্ধা স্পর্শ করতে হয়। যেমন- পাণ্ডব, প্রণব, শিষ্যেণ ইত্যাদি।

ঝ)  হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বর
‘হ্রস্ব স্বর’ হ্রস্ব অর্থাৎ কম চাপ দিয়ে এবং ‘দীর্ঘ স্বর’ দীর্ঘ অর্থাৎ বেশী চাপ দিয়ে বা একটু টেনে উচ্চারণ করতে হয়। দীর্ঘস্বরের উদাহরণ- অনীক = অন্ইইক্অ, চমূম্ = চম্উউম্, ইত্যাদি।

ঞ) লুপ্ত অ (ঽ)
সংস্কৃত শ্লোকের পদসমূহের মাঝে অনেক সময় ‘মাত্রাহীন হ’ (ঽ)-এর মতো একটা বর্ণ দেখা যায়। অনেকেই একে বাংলা হ-এর মতো উচ্চারণ করেন। এটা গুরুতর ভুল। ‘ঽ’-এটা হ নয়, বরং লুপ্ত ‘অ’। অর্থাৎ ‘অ’ উচ্চারণ করতে যতটুকু কণ্ঠে জোর দিতে হয় ঽ উচ্চারণ করতে তার চেয়েও কম জোর দিতে হয়। যেমন- মেঽচ্যুত (মে+অচ্যুত), শ্রেয়োঽনুপশ্যামি (শ্রেয়ো+অনুপশ্যামি), ইত্যাদি।

 

সংস্কৃত ভাষা বিষয়ে বিস্তারিত অধ্যয়ন করতে নিচের ওয়েবসাইটগুলো বেশ সহায়ক:

১। https://learnsanskritonline.com/

২। https://sanskritdocuments.org/

৩। http://esosanskritasikhi.blogspot.com/

৪। https://www.masteranylanguage.com/c/p/o/Sanskrit

৫। http://www.acharya.gen.in:8080/sanskrit/lessons.php

৬। http://learnsanskritlanguage.com/